নামটি দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছিলাম কথাসাহিত্যিক হিসাবে। এখানে ওখানে তাঁর গল্পও পড়েছি। শুনেছি তাঁর দু’একটি বইয়েরও নাম। কিন্তু তাঁর সাথে পরিচয় হলো এই চতুর্থবারের মতো অস্ট্রেলিয়ায় এসে। তাও শেষবার মেলবোর্ন ছেড়ে কুইন্সল্যান্ডে এসেছি বলেই হয়ত পরিচয়টা হলো। তাও ফেসবুকে। ফেসবুক থেকে ফেস টু ফেস পরিচয় হতে সময় নেননি মহিবুল। প্রতিবার দেখাতেই তাঁর এলাহি কাণ্ড। প্রতিবারের দেখা দিয়েই একেক পর্ব গল্প হয়ে যায়। কিন্তু সে তো ব্যক্তি মহিবুলকে নিয়ে। কিন্তু মহিবুলের সাথে যতবার দেখা হয়েছে, তিনি প্রবাসে তাঁর যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা বই থেকে একবারও একটি বই এনে আমাকে বলেনন না, ‘আপা, এটা পড়ে শেষ করেন, পরের বার এসে আমি এটা নিয়ে যাবো।’ তাহলে তাঁকে নিয়ে আমার একটি লেখা এতদিন তৈরি হয়ে যেত। একজন লেখকের দায়, তাঁর ধারেকাছের লেখকদের লেখা নিয়ে কথা বলা। এটা দু’পক্ষের জন্যই সম্মানজনক। মঙ্গলজনক। তা না হলে সে লেখক বন্ধু বা লেখক আপা কিসের ! পরিবারের সদস্যদের সাথে সস্পর্কটা টানা থাকে এক চালের নিচে থাকতে হয়, একপাকে খেতে হয় বলে। নাহলে রক্তের বন্ধনও অত তীব্র নয়, শুধু যাদের নিয়ে জীবন বুঁদ হয়ে থাকতে পারে।তাই সেই সেই ঘর- আর খাদ্য ছাড়াও পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে হাজার মানুষের ভিড় থেকে একজন একই নেশার মানুষ তার সৃষ্টিশীলতা নিয়ে মেতে উঠতে তার মতো আরো উদ্বুদ্ধ প্রাণ খুঁজতে থাকে। কারণ নেশার উপাত্ত এমনি! যে কোনো একটি নেশা ছাড়া মানুষের একত্র হওয়ার উপায় নেই। ভাত, মাছ, দুধ, মধু সুখাদ্য যা, তা মানুষ একাই খায়। কিন্তু ক’জন গাঁজা খাওয়া মানুষ কি করে যেন অচেনা নগরেও জটলা পেকে যায়। যে কোনো কিছু সৃষ্টির নেশাও ঠিক তেমনি! সে জন্য যেখানেই আমি যাই আমার ক্ষুদ্র শক্তি-সামর্থ দিয়ে আমি সমমনা মানুষদেরকে একত্র করে রাখার চেষ্টা করি। কুইন্সল্যান্ডে বসবাস করা বাংলাদেশের আরেক কথাশিল্পী Mostafizur Rahman Titu মাত্র পরশুই ফোনে বলছিলেন, ‘আপা, আপনার সাথে বললে মনেহয়, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি!’ লেখক টিটোর এই মন্তব্য অবশ্যই জীবনে একটি প্রাপ্তি ! টিটো আমাকে তাঁর ‘প্রথম কুঁড়ি’ বইটি দিয়েছিলেন। আমি সেটা পড়ে মহিবুল আলমকে দিয়ে আসছি। যেন একই শহরে বসবাস করা এক লেখকের সাথে আরেক লেখকের মুখোমুখি পরিচয় ঘটে। ১৭ সেপ্টেম্বর আমার জন্মদিন গেল। চারচারটি খবরের কাগজসহ প্রত্যাশার অধিক মানুষ আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তারচেয়ে বড় চমক দিয়েছেন মহিবুল ও তাঁর স্ত্রী জলি। দুজন চাকুরীজীবি মানুষের ব্যস্তসমস্ত সারা সপ্তাহ থেকে একসাথে দু’জন অবসর বের করে, বাজার করে আলাদাভাবে রান্নাবান্না করে সকাল থেকে সেসব পোটলা বেঁধে বাইরে আনা, সেই যে প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলিতা পাকাইবার যেমন আরো একটা আয়োজন থাকে। কবে আমি ঘাসের ওপর বসে খেতে চেয়েছিলাম, তা আমি ভুলে গেলেও মহিবুল ভোলেননি। দুপুরে সেই খাওয়া সেরে সুউচ্চ বাঁধের ওপর একচক্কর আনন্দ বিহার সেরে মহিবুল নিয়ে গেলেন প্রশান্ত মহাসাগরের কূলে। সেখানে বের করলেন, লুকিয়ে রাখা কেক, মোমবাতিসহ জন্মদিনের আয়োজনের যাবতীয় সরন্জাম। দেশের মানুষই যাকে চেনেন না, চিনলেও গোণেন না, এমন এক লেখিকার জন্মদিনের উৎসবটিকে মহোৎসব করে তুলতে মহিবুল আমার পুরো গোষ্ঠীসহ টেনে নিয়ে গেছেন মহাসাগরের কূলে। বউটি সেখানেই তার মতো করে ধরিয়ে দিলেন চমৎকার একটি ভ্যানিটি ব্যাগও। তাও আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমি বারবার পেয়ে জানি, মানুষ সব সময় সবকিছু তার যোগ্যতায় পায় না! তবে আমি আমার অগ্রিম সব প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে ওঠার একটা আপ্রাণ প্রয়াস প্রাণে পুষে রাখি। ‘যা কিছু পেলাম না সে আমার নয়’ মেনে নেয়ার সাথে প্রাপ্তিগুলো মূল্যায়ণ করি। এই যে নিজের সম্পর্কে এতকিছু বলতে পারলাম, সে তো মহিবুলের কারণে। মহিবুল আমাকে আপা ডাকেন। কিন্তু ওঁকে দেখলে আমার বড় ছেলেটির কথা মনে পড়ে যায়। আর সন্তানতুল্য এবং ভ্রাতৃসুলভ একটা মিশ্র মমতা আমার ভেতরে একেবারে নিজের যোগ্যতায় গাঢ় করে নিয়ে নিয়েছেন মহিবুল। আমার ছেলের থেকে আমি ষোল বছরের বড়। মহিবুলের থেকে আট বছরের, সম্ভবত। যা হোক, আইপ্যাডে লিখছি। তাই লেখা আর এগোচ্ছে না। টেনেটুনে আর যেটুকু লিখতে পারবো, তা দিয়ে এই কথাই লিখে পণ করি, মহিবুল আলম লেখক হিসাবে যেমন বড়, তেমনি মানুষ হিসাবে অসাধারণ লিখতে হলে অন্তত দশটি স্বরে ‘অ’ লিখে নিতে হয় তাঁরবেলা, যত্রতত্র লিখে সাধারণ করে ফেলা এই ‘অসাধারণ’ শব্দটির আগে। আর ওঁর বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে ওঁর যে পরিবারটি, মনেহয় আল্লাহ একটু বেশিই রহমত দিয়ে সবার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। মহিবুলকে নিয়ে আমার একটি শক্তপোক্ত গল্প লেখার ইচ্ছে দানা বাঁধতে শুরু করেছে…। ‘পণ’ হিসাবেই সেটাই লিখিত রাখতে শীবের গীতের মতো শেষবেলায় নিজের এত কথা, যেমন ফুলটি ফোটাতে তো আগে লতায়পাতায় গাছটি আঁকতে হয় …

দিলতাজ রহমান