| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২১

image

শক্তিমান কথাসাহিত্যিক মহিবুল আলম বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার মুরাদনগরের মানুষ। কাছেই গোমতী নদী দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে একসময় নিউজিল্যান্ড পাড়ি দেন। সেই পেশাগত জীবন থেকে আবার দেশ বদল। এবার অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড প্রদেশের গোলকোস্টে থাকেন তিনি। ২৩ বছরের প্রবাস জীবন। প্রবাস জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত দেখতে দেখতে অভিজ্ঞতা বাড়ে। একদিন প্রবাসে এক বন্ধু তাঁর জীবন যন্ত্রণার কথা শোনান। তাঁর নাম আঁখি। পেশাগত জীবনের ব্যস্ততায় ভুলে গিয়েছিলেন সেসব কথা। অবশেষে বন্ধুর দাম্পত্য জীবনের ভাঙন, প্রেমহীনতা নিয়ে নিউজিল্যান্ড ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৬৫৫ পাতার ‘জোড়া সিঁথি নদীর তীরে’ নামে এক দীর্ঘ উপন্যাস লেখেন মহিবুল আলম। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের একুশে বইমেলায় ঢাকার ‘শোভা প্রকাশ’ থেকে বইটি বের হয়। প্রচ্ছদ শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগর। উপন্যাসটি এর আগে দৈনিক পত্রিকার অনলাইন পোর্টাল দূর পরবাসে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রথমেই বলে রাখা দরকার, এতো দীর্ঘ উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠকের ক্লান্তি আসে না। উপন্যাসের মূল চরিত্র রাকিব। রাকিবুল আলম। ডাকনাম আঁখি। অন্তর্মুখী স্বভাবের এই যুবকের বাড়িও কুমিল্লার মুরাদনগরে। পাশেই গোমতী নদী। সেখানকার কাজীবাড়ির একসময় নামডাক ছিল। বর্তমানে সেসব হারিয়ে গেছে। কাজীবাড়ির বড় ছেলে অর্থাৎ রাকিবের বড় চাচা বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সচিব। ধানমণ্ডি নর্থ রোডে থাকেন। ছোটচাচা সেনাবাহিনীর অস্ত্রগুদামের স্টোরকিপার ছিলেন। বিয়ে করার পর বেশিদিন সংসার করতে পারেননি। দুর্ঘটনায় মারা যান। আর রাকিবের বাবা কাজীবাড়ির মেজ ছেলে কাজী ফরিদ আহমেদ হাবাগোবা ধরনের মানুষ ছিলেন। অন্যের বাড়িতে কামলা দিতেন। অকারণে হাসতেন। তাঁর এই স্বভাবের জন্য রাকিবের ক্লাবের বন্ধু-বান্ধবরা ঠাট্টা-তামাসা করত। এতে মনে মনে রাকিবের কষ্ট হত। রাকিবের মা ছিলেন অসাধারণ রূপবতী। তাঁর দাদি, চাচিরা বলতেন, একদম প্রতিমার মতো, পানপাতার মতো মুখ। সাতপুরুষে এমন সুন্দরী বউ কাজীবাড়িতে আর আসেনি। রাকিবের তখন চার বছর বয়স। হঠাৎই তাঁর মা দক্ষিণ কাজীবাড়ির মোখলেস কাজীর জায়গির মাস্টারের হাত ধরে চলে যান। বউ হারানোর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে প্রায় সন্ধ্যায় তাঁর বাবা গোমতীর দক্ষিণ দিকে চলে যেতেন। ঘাটে বসে বউয়ের জন্য কাঁদতেন। রাকিবকে জন্মের পর থেকে কারও না কারও বোঝা হয়ে উঠতে হয়েছিল। এই পোড়া সংসারে জন্মেও স্কুলে কখনও দ্বিতীয় হননি তিনি। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান নিয়ে অনার্স শেষ হতে না হতেই বড় চাচার পীড়াপীড়িতে নিউজিল্যান্ড পাড়ি দিতে হয় তাঁকে। শুরু হলো বিদেশবিভুঁইয়ের লড়াই। অবজ্ঞা-অবহেলায় বেড়ে ওঠা রাকিব কোনওদিনই বুঝতে পারেননি ভালোবাসা কী জিনিস। রিনেই ভাবি ও হাসানুজ্জামান হাসানের বাড়িতে যখন রাকিব থাকতেন, তখনই রিনেই ভাবির চাচাতো বোন এমেন্ডার সঙ্গে পরিচয়। তারপর বিয়ে। সাদিয়া নামে একটি মেয়েও ছিল রাকিবের। মেয়েটি আড়াই বছর বয়সে ক্যান্সারে মারা যায়। এমেন্ডার সঙ্গেও বিচ্ছেদ ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সিরাজই তাঁর জীবনটাকে এলোমেলো করে দিল। রাকিবের ছন্নছাড়া জীবনে সেভাবে বহু বছর কোনও নারী আসেনি। অবশেষে একটি বিয়েবাড়িতে পরিচয় হয় নদীর সঙ্গে। মেয়েটি ঢাকা থেকে এসেছেন। গায়ের রং শ্যামলা। নিউজিল্যান্ডের ওয়াইকাটো বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছেন। মা আল্পনা চৌধুরী কলেজে পড়ান। দু’জনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়তে থাকে। সেই স্কুলজীবনে একদিন ছোটচাচি সাদিয়ার রূপে মুগ্ধ হয়ে যে রাকিব একদিন কবিতা লিখে ফেলেছিলেন, সেই রাকিবের জীবনে নদী আসার পর থেকে আবার কবিতা লিখতে শুরু করেছেন। উপন্যাসে প্রায় ১৯ বছর পর ফোনে রাকিবের সঙ্গে তাঁর মায়ের কথা হয়। মা দুবাইয়ে থাকেন। সেখানে তাঁর দ্বিতীয় বরের সোনার দোকান আছে। তাঁর একটি ছেলেও ছেলে। নাম নয়ন। অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি করেন।

‘জোড়া সিঁথি নদীর তীরে’ উপন্যাসটিতে লেখক মহিবুল আলম বহু মাত্রিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আধুনিক জটিল জীবনের ছকে পড়ে জীবিকার প্রয়োজনে কীভাবে মানুষের জীবন ধারা বদলে যাচ্ছে, সেই ছবিও এই উপন্যাসে স্পষ্ট। লেখক তুলে ধরতে চেয়েছেন বাংলাদেশ তথা এই উপমহাদেশের বেকার যুবকদের জীবিকার প্রয়োজনে কীভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। এই লড়াই চালাতে গিয়ে এই উপমহাদেশের মানুষের কীভাবে ভাষা-সংস্কৃতিও বদলাতে থাকে। লেখককে সত্যের কাছাকাছি থাকতে হয়। সেই সত্য কখনও কখনও কারও বিপক্ষে চলে যেতেই পারে। রাকিব যেহেতু কবি স্বভাবের তাই তাঁর জীবনে নারী আসবেই। রোম্যান্টিকতা আসবেই। ছোটচাচা যখন চাচিকে বিয়ে করে আনেন, তখন চাচির বয়স ১৬। রাকিবের চেয়ে বছর খানেকের বড়। কবি স্বভাবের রাকিব যে তাঁর ছোটচাচিকে দেখে কী মুগ্ধই না হয়েছিলেন। লেখকের বর্ণনায় সেই রোম্যান্টিক আবহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘ছোটচাচার বিয়ে করে আসার ঘটনা। কেউ একজন ছোটচাচির শাড়ির কুচি ধরায় গোড়ালি সমেত পা দেখা যাচ্ছিল। মুখ দেখার আগে চাচির পা দেখা দেখেছিল। ছোটচাচির উজ্জ্বল শ্যামলা পায়ে লাল টকটকে আলতা মাখা। তাঁর জুতোগুলোও লাল রঙের ছিল। হঠাৎ করেই তখন মেঘ ভেঙে রোদ উঠেছিল। পড়ন্ত বিকেলের মেঘ ভাঙা রোদে তাঁর পা দুটিকে

অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছিল’…। মেয়েদের পায়ের সৌন্দর্য প্রসঙ্গে দেব আনন্দ ও ওয়াহিদা রহমান অভিনীত হিন্দি সিনেমা ‘গাইড’-এর কথা না বললেই নয়। সেখানেও বলিউডের হার্টথ্রব অভিনেত্রী ওয়াহিদা রহমানের পায়ের সৌন্দর্য পরিচালক সুচারুভাবে ব্যবহার করেছেন। রাজ কাপুর-ওয়াহিদা রহমান অভিনীত অপর একটি সিনেমায়ও ওয়াহিদা রহমানের পায়ের সৌন্দর্য ফুটে উঠেছিল। লেখক মহিবুল আলমও রাকিবের ছোটচাচি সাদিয়ার নিখুঁত পায়ের সৌন্দর্য তুলে ধরার মধ্য দিয়ে রাকিবের রোম্যান্টিকতার দিকটি স্পষ্ট করে তুলেছেন।

লেখক মহিবুল আলমের আরও একটি রোম্যান্টিক বর্ণনা তুলে ধরছি, ‘রাকিব ভাবল, সেই ছোটচাচি! যিনি তাঁকে বৃষ্টিতে ভিজতে শিখিয়েছিলেন। বিকেলের সূর্য ডোবার গান বাঁধতে বলেছিলেন। তাঁর সঙ্গেই মধ্যরাতে জ্যোৎস্নায় স্নান করতে করতে কোনও একদিন সে কবিতা লিখতে বসেছিল…!’ রাকিবের জীবনে তাঁর ছোটচাচি যেন অন্তঃসলিলা প্রবাহের মতো প্রবাস জীবনের ফাঁকে ফাঁকে গভীর খাতে বয়ে যান। স্মৃতির সরণি বেয়ে ঘুরে ফিরে আসেন। এ যেন রাকিবের কাব্যনারী। মানস প্রেমিকা। আর এমেন্ডা তো তাঁর বিবাহিত স্ত্রী। তাঁদের দু’জনের সংসারে যে মেয়েটি জন্ম নিয়েছিল, তার নামও কেন যেন ছোটচাচির নামেই সাদিয়া রেখেছিলেন রাকিব।

উপন্যাসের অনেকগুলো পর্ব এগিয়ে যাওয়ার পর লেখক রাকিবের একমাত্র বিবাহিত স্ত্রী এমেন্ডাকে জায়গা দিয়েছেন। এমেন্ডার সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ বছরের সংসার। সেই যে সিরাজের সঙ্গে এমেন্ডা চলে গিয়েছিলেন। তারপর আর রাকিবের সঙ্গে দেখা হয়নি। অবশেষে মেয়ে সাদিয়ার স্মৃতিকে কেন্দ্র করে দু’জনের আবার দেখা হলো। এমেন্ডার মধ্যে তখন অনুশোচনা এসেছে। লেখকের বর্ণনায় এমেন্ডার স্বীকারোক্তি, ‘এমেন্ডা ঝুঁকে রাকিবের একটি হাত মুঠো করে ধরে বলল, আমাকে ক্ষমা করে দিও! রাকিব তার হাতটা টেনে নিতে গিয়ে নিল না। হাতের স্পর্শে তৎক্ষণাৎ এমেন্ডার সেই আগের উষ্ণতা অনুভব করল। সে দেখল, এমেন্ডার চোখ ভিজে আসছে। রাকিব মূক হয়ে তাকিয়ে রইল’…।

মহিবুল আলম লিখেছেন, ‘রাকিব বুঝতে পারল, কাছাকাছি থাকার চেয়ে বিচ্ছিন্নতাতেই ভালোবাসা অনেক গভীরে জিইয়ে থাকে’…। এমেন্ডার জন্যই তো রাকিবের জীবন ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিল। মায়ের অনুরোধেও বিয়ে করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। এমনকি ছোটফুফু ফোনে বারবার বলা সত্ত্বেও।

উপন্যাসের একটা পর্বে রাকিব কয়েক শো কিলোমিটার ড্রাইভ করে এমেন্ডার সঙ্গে দেখা করেন। লেখকের বর্ণনা থেকে এটা স্পষ্ট রাকিবের ভালোবাসায় গভীরতা ছিল। লেখক উপন্যাসে তাঁর মাকে, নদীকে, এমনকী জাহিদ, আজমল হোসেন স্যারকে যতখানি জায়গা দিয়েছেন। এমেন্ডার জন্য কিন্তু ততখানি জায়গা দেননি। এই দীর্ঘ উপন্যাসে লেখকের এমেন্ডার প্রতি কেন এই কার্পণ্য তা বোঝা যায়নি। রাকিব-এমেন্ডার পাঁচ বছরের সংসার। নেহাতই কম সময় নয়। অতএব উপন্যাসে প্রকৃতির নিখুঁত বর্ণনা, মাউরি ইতিহাসের বিস্তারিত বর্ণনাকে কিছুটা ছাটকাট করে এমেন্ডার জন্য আরও একটু জায়গা দেওয়া যেতেই পারত। দু’জনের প্রেমোপাখ্যান নিয়ে কয়েকটি পর্ব থাকলে মন্দ হত না। সেক্ষেত্রে লেখকের উদাসীনতাই প্রকাশ পেয়েছে।

ছোটচাচি সাদিয়া যদি রাকিবের জীবনে পর্বত থেকে নেমে আসা প্র¯্রবণ ধারা হয়ে থাকেন, তাহলে এমেন্ডা অবশ্যই সমতলের নদী বলতে হয়। আর তৃতীয় নারী সেক্ষেত্রে মোহনা। যেখান থেকে যে কোনও নদী সমুদ্রের ব্যাপ্তিতে পৌঁছোয়। টুইন রিভার রেস্টুরেন্টে প্রথম দেখা থেকে ধীরে ধীরে সম্পর্ক গভীর হয়। তথাকথিত প্রেম প্রস্তাবের ধার ধারেননি। তবুও কখন যেন দুজনের মধ্যে গভীর বিশ্বাস প্রেমে পরিণতি লাভ করেছে। রাকিব তাঁকে নিয়ে কত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। নদীর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে নদীর শিক্ষক প্রফেসর ড. নিকোলাস রজারসনের মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তির সান্নিধ্য লাভ হয়। নদীর আত্মীয়ার সঙ্গে পরিচয়। মৌনতার পাকা পাকা কথা। এইভাবেই রাকিব নদীর ভেতর যেন ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে’ বনলতা সেনের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন।

নদীও যারপরনাই রাকিবকেই একজন নির্ভরশীল মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। আসলে রাকিবের জীবনে যেমন একজন নারীর অভাব প্রকট হয়ে উঠেছিল। ঠিক তেমনি নদীও কোথাও নির্ভরতা খুঁজছিল। শেকড়বিহীন বিদেশবিভুঁইয়ে রাকিব-নদীর ভালোবাসা বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে নিউজিল্যান্ডের জল, হাওয়া, প্রকৃতি, ইতিহাসের মধ্যে ডানা মেলে উড়তে শুরু করে। রাকিব ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে দেখে, ‘নদী টিয়ে রঙের শাড়ি পরে এসেছে। গলায় ও কানে তাঁর দেওয়া এমারেল্ডের গহনার সেটটা। কপালে একটা সবুজ টিপও রয়েছে। ঠোঁটে খয়েরি লিপস্টিক। বিকেলের একচিলতে রোদ এসে নদীর চেহারায় পড়েছে। নদীকে ঠিক রাজকন্যার মতো মনে হচ্ছে। টিয়ে রাজকন্যা। বহুকাল আগে ছোটচাচিকে যেমন টিয়ে রঙের শাড়ি পরলে টিয়ে রাজকন্যা মনে হতো…’।

লেখক অবশ্য রাকিবের মাকে উপন্যাসে অনেকখানি জায়গা দিয়েছেন। এটা অবশ্যই কাম্য। কারণ যতই মা পরপুরুষের সঙ্গে চলে যান, মা মা-ই। তাঁর সঙ্গে যে নাড়ির টান রয়েছে, তা প্রকাশ পাবেই। তাই অন্তর্মুখী স্বভাবের রাকিব এতো বছর পরে মায়ের ফোন পেয়ে আবেগে আপ্লুত তো হবেই। কিন্তু সেই বহিঃপ্রকাশ রাকিবের মধ্যে দেখা যায়নি। অবশ্য মায়ের জন্য ভেতরে ভেতরে অন্তঃসলিলা ¯্রােত তো আছেই। তাই উপন্যাসের শুরুতে ১৯ বছর পর মায়ের ফোন পেয়ে অতীত শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করেন রাকিব। রাকিবের মনে পড়ে যায়, ‘মা চলে যাওয়ার পর বেশিরভাগ সময় রাকিবের সঙ্গে দেখা করতে এলে দুপুরে আসতেন। স্কুল বিরতির সময় মিষ্টির দোকানে চলে যেতেন। একবার একটি বাচ্চা ছেলেকে এনেছিলেন। সে খুব কাঁদছিল। পরে বাচ্চাটিকে আর আনেননি। সেই বাচ্চাই অস্ট্রেলিয়ায়? রাকিবের ওই ভাইটি ফরসা। একদম মায়ের ফটোকপি’।

জাহিদ, আজমল হোসেনও শেকড়হীন। যাদের নিউজিল্যান্ডের আপেল বাগানে কর্মব্যস্ত জীবন কাটে। দুই বাংলায় যেহেতু আপেল, আখরোট হয় না, তাই তাদের কর্মজীবনের ঘাত-প্রতিঘাত বাঙালি পাঠককে ভিন্ন স্বাদ এনে দেয়। প্রবাস জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল লেখকের ভৌগোলিক জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই দিকটি উপন্যাসে ফুটে উঠেছে। এছাড়াও ইতিহাস নিয়ে লেখকের ফান্ডা রয়েছে। স্টোরি টেলিঙের মাধ্যমে মাউরি ইতিহাসের নানা প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন লেখক। তুলে ধরেছেন মাউরি মিথ। রূপকথার গল্পের মতো সেসব কাহিনি মরমে সুখের উদ্রেক ঘটায়। আগেই বলেছি, লেখককে সত্যের কাছাকাছি থাকতে হয়। আর সত্যকে ধরে রাখতে গেলে বন্ধু ব্যাজার হতেই পারে। মহিবুল সাহেব সেসবের পরোয়া করেন না। নিউজিল্যান্ড পাড়ি দেওয়ার পর প্রবাসী বাঙালির একটা বড় সমস্যা নাগরিকত্ব নিয়ে। ফলে প্রবাস জীবনে কাগুজে স্ত্রী বানিয়ে নেওয়ার একটা প্রতিযোগিতা চলে। একদিকে যেমন নিউজিল্যান্ডের মেয়েরা বিয়ে করে সামান্য কারণেই বিচ্ছেদের পথে হাঁটে, এমনটা দেখিয়েছেন লেখক। অন্যদিকে, বিদেশিনী বিয়ে করে তাদের জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ারও ছবিটা রিনেই ভাবির মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাঙালি স্বভাবের কিছু বদদোষ তো আছেই। এক্ষেত্রে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের প্রসঙ্গ টানতে হয়। লেখক শরৎচন্দ্র সেখানে দেখিয়েছেন বাঙালিরা বিয়ে করে সংসার বসিয়ে কীভাবে সংসার ফেলে নিশ্চিন্ত মনে স্বদেশে ফিরে আসতেন। স্বদেশে এসে আবার বিয়ে করতেন। মায়ানমারের মেয়েদের প্রতি অমর্যাদার মতো নিউজিল্যান্ডেও এমনটাই কদাচিৎ ঘটে থাকে। অতএব এই সত্যকেও অস্বীকার করা যায় না। অপরদিকে নিউজিল্যান্ডের মানুষের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে লেখক সমালোচনা করেছেন রাকিব, নদী চরিত্রের মধ্য দিয়ে। নিউজিল্যান্ডের ছেলেমেয়েরা ১৮ বছর হলে বাবা-মা ছেড়ে আলাদা থাকতে শুরু করে। তারপর প্রতিষ্ঠা পায়। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা একাকিত্বে ভুগে বিয়ে করে। ছেলেমেয়েরা কোনও যোগাযোগ রাখে না বাবা-মায়ের সঙ্গে। ফলে মিসেস স্মিথ চরিত্রটির অনাদরে মৃত্যুই কাম্য। তারা এই উপমহাদেশের সংস্কৃতি, মূল্যবোধের মতো ছেলেমেয়ে, নাতিনাতনি নিয়ে আনন্দটা শেষ জীবনে উপভোগ করে যেতে পারেন না। বাংলাদেশের যে সমস্ত মানুষ প্রবাসে রয়েছেন, তাদের ছেলেমেয়ে নিয়েও আতঙ্কে ভোগেন সেই প্রবাসী বাঙালিরা।

ইতিহাসের পাশাপাশি প্রকৃতি নিয়েও লেখকের ফান্ডা রয়েছে। লেখকের একটি বড় গুণ বর্ণনার ওপর মুন্সিয়ানা। বিভূতিভূষণ, বুদ্ধদেব গুহ, জীবনানন্দের মতো তিনিও প্রকৃতি প্রেমিক। তাই তাঁর উপন্যাসে ছেঁড়া মেঘ, কাঁচাসোনা রোদ, হিন হিন বাতাস, বরফ ভাঙার মচ মচ শব্দ, আপেল, আঙুর, এপ্রিকট বাগান থেকে শুরু করে পাইন গাছ, ক্যাবেজ গাছ, চার ঋতুতে ম্যপল গাছের চার রকম রূপ দেখা যায়। উপন্যাসের ছত্রেছত্রে বালিহাঁস? রাজহাঁস, ডাহুক, জংলি কবুতর, গানেট পাখি, চিত্রা হরিণ সহ নানা প্রাণীর রেখচিত্র এঁকেছেন লেখক। রাকিব প্রকৃতিপ্রেমী। সে ব্লাফহিলের চূড়ায় বসে প্রশান্ত মহাসাগরের জলে সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব উপভোগ করে। তাঁর উপন্যাসে একদিকে যেমন বাংলাদেশের কুমিল�া জেলার উপজেলা মুরাদনগরের গ্রাম ছবির মতো ফুটে ওঠে। অন্যদিকে, গোমতীকেও নিজের প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো করে তুলেছেন। লেখক হুমায়ূন আহমেদের ‘ময়ূরাক্ষী’ উপন্যাসে হিমুর ভিতরে একটা নদী বাস করে। লেখক মহিবুল আলমের নদী অবশ্য একেবারেই ভিন্ন। তাঁর স্মৃতিকথনেই চিত্রিত রূপ নেয়। নিউজিল্যান্ডের ওয়াইকাটো ও মুরাদনগরের গোমতী নদীকে কোথায় যেন সমার্থক বানিয়ে ফেলেছেন। এই মেলবন্ধনই উপন্যাসকে দেশ-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। এখানেই লেখকের উপন্যাসের উত্তরণের ছবিটা ঠিক হয়ে গেছে। ‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন’। লেখক সত্যিই মিলিয়েছেন। তাই মৌনতার জন্য মিসেস স্মিথের ভালোবাসা, রিনেই ভাবির জন্য রাকিবের কষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। উপন্যাসের এই অংশটি এক অন্য প্রতীকী রূপ সৃষ্টি করে, যা তুলে না ধরলেই নয়, ‘হাকুরিমাতা পাহাড় থেকে রাকিব যখন নিচের ওয়াইকাটো ও ওয়াইপা নদী দুইটা পাশাপাশি দেখছিল, তখন তার কাছে মনে হয়েছিল, এ যেন রমণীর মাথায় বিলি করে জোড়া সিঁথি করা কোনো জোড়া সিঁথি নদী। দ্য পয়েন্ট যেন সেই জোড়া সিঁথি নদীর তীরে’…।

পরিশেষে বলি, লেখক নিজে যেহেতু প্রকৃতিপ্রেমিক, তাই উপন্যাসের নামকরণেও প্রকৃতির অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন প্রতীকীর মাধ্যমে। লেখনীর ক্ষেত্রে পাঠক সমাজে মহিবুল আলমের যতটুকু সমাদৃত হওয়ার কথা ছিল, বাংলাদেশের পাঠকের কাছে তিনি এখনও তেমন জনসমাদর পাননি। সেটা অবশ্যই তাঁর প্রচারবিমুখ স্বভাবের কারণেই। এই সীমাবদ্ধতা ভেঙে তাঁর লেখনী অচিরেই বৃহত্তর বাঙালি পাঠকের মনে জায়গা করে নেবে, এটুকু বললে অত্যুক্তি হবে না।

বিবেকানন্দ বসাক | Source: The Sangbad