রূপকথার স্বর্গভূমি নিউজিল্যান্ড

।। আটাশ ।। সুগন্ধী এক পাহাড়ের গল্পবিকেলের সূর্যটা হেলে পড়েছে। চারদিকে বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরে বিকেলের কাঁচা সোনা রোদ বিছিয়ে রয়েছে। আমরা মাউন্ট পিরংগিয়ার চূড়ায় একটা কাঠের ডেকের উপর দাঁড়ালাম। কাঠের ডেকের রেলিংটাও কাঠের। কাঠের ডেকটা বানানো হয়েছে মূলত পর্যটকদের ভিউ পয়েন্ট হিসেবে। ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে মাউন্ট পিরংগিয়ার সামনে-পেছনে দিগন্ত বিস্তৃত সমতল সবুজ ভূমি দেখা যায়। দক্ষিণের সবুজ ভূমির যেখানে শেষ, ঠিক সেখানটায় কাফিয়া হারবার। উত্তরের সবুজ ভূমির পর কয়েকটা গ্রাম পেরিয়ে হ্যামিল্টন শহর। পশ্চিমের ভূমি অবশ্য এতটা সমতল নয়। সেদিকে বেশ কয়েকটা ছোটবড় পাহাড়। বিকেলের সূর্যটা যেন সেই পাহাড়গুলোর উপর স্থির হয়ে আছে। মাউন্ট পিরংগিয়ার পুবে পিরংগিয়া শহর। পিরংগিয়া শহরকে ঠিক শহর বলা যায় না। আবার গ্রামও বলা যায় না। বলা যায় মফস্বল শহর বা উপশহর। কিন্তু শহরটা অদ্ভুত সুন্দরভাবে সাজানো গোছানো। এ শহরের বাসিন্দারা খুব ধনী ও সৌখিন। বেশিরভাগই ইউরোপিয়ান সাদা কৃষক। আর আছে কিছু সৌখিন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। যথারীতি একটা ছোট্ট টাউন সেন্টার, একটা ফোর স্কয়ার, একটা রাগবি ক্লাব, কয়েকটা পাব, একটা স্কুল, একটা পুলিশ স্টেশান ও একটা ফায়ার সার্ভিস অফিস নিয়ে শহরটা দাঁড়িয়ে আছে। পিরংগিয়া শহরটা পেছনে ফেলে আরও পুবে গেলে আরেকটা পর্বত। মাউন্ট করিনই। মাউন্ট পিরংগিয়া থেকে মাউন্ট করিনইর দিকে তাকালে মনে হয়, বিশাল সবুজ প্রান্তরের ভেতর নিঃসঙ্গ পথিক হয়ে যেন পর্বতটা দাঁড়িয়ে আছে, আর দূর থেকে মাউন্ট পিরংগিয়াকে হাতছানি দিচ্ছে। আমরা যে কাঠের ডেকের উপর দাঁড়িয়ে আছি, সেই ভিউ পয়েন্টের পর সবুজ ঘাসের ঢাল নেমে গেছে অনেকদূর পর্যন্ত। মাউন্ট পিরংগিয়ার মাথা থেকেই শুরু হয়েছে পিরংগিয়া ফরেস্ট পার্ক। পিরংগিয়া ফরেস্ট পার্কের ভেতর ধরে অনেকদূর হেঁটে যাওয়া যায়। আমার পাশে দাঁড়ানো আনোয়ার জাবেদ বাপ্পি আমাকে অনুরোধ করল, চলেন না, ফরেস্ট পার্কের ভেতর হেঁটে আসি। আশরাফ খোকন পাশ থেকে সায় দিলেও আমার কেন জানি ভিউ পয়েন্ট থেকে সরতে ইচ্ছে হলো না। ভাবলাম, ফরেস্ট পার্কে হাঁটতে তো পারবোই। পুরো বিকেলটা পড়ে আছে। আপাতত আমি সবুজ বিস্তৃত প্রান্তর দেখতে চাই।আমি মাউন্ট পিরংগিয়া নিয়ে মাউরি মিথটা জানি। মাউন্ট পিরংগিয়ার পুরো নাম- পিরংগিয়া-ওটি-আরও- আরও-কাহু। অর্থাৎ কাহুর চলার সুগন্ধী একটা পথ। সন্ধ্যার পর সত্যি মাউন্ট পিরংগিয়ার চূড়ায় সুগন্ধে ভরে যায়। সন্ধ্যা পেরিয়ে উঠতি রাত হতেই পিরংগিয়া ফরেস্ট পার্কের ভেতর থেকে মিহি সুরে বাঁশির শব্দ আসে। তেরোশো শতাব্দীর প্রথম দিকে ওয়াইকাটো টাইনই ট্রাইবের লোকজন সাতটি ডিঙি নিয়ে কাফিয়া হারবারে এসে বিশ্রামের জন্য নামলে তাদের একজন বিধবা অল্পবয়সী নারী দিঘল প্রান্তর পেরিয়ে মাউন্ট পিরংগিয়া পর্বতে উঠে আসে। সন্ধ্যায় পর্বতের উপর অদ্ভুত সুগন্ধে ভরে যেতে দেখে পর্বতের নাম দেয়- মাউন্ট পিরংগিয়া। মাউন্ট পিরংগিয়ার উপর সন্ধ্যার পর অদ্ভুত সুগন্ধে ভরে যাওয়ার পেছনে এক চমৎকার মাউরি মিথ আছে। এই মিথটা ফানাফানা ও টাফিয়াটুর প্রেমের এক অমর মিথ। আসলে আমরা এগুলোকে মাউরি মিথ হিসেবে ভাবলেও মাউরি আদিবাসীরা এগুলোকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। ফানাফানা হলো তাদের প্রেমের দেবতা আর টাফিয়াটু হলো তাদের প্রেমের দেবী। বন্ধুরা, আমি তাহলে ফানাফানা ও টাফিয়াটুর পুরো মিথটা বলি। ফানাফানা প্রেমের দেবতা হলেও সে ছিল মানুষের বেশভূষা ধারী ভূত সম্প্রদায়ের। মাউন্ট পিরংগিয়া ও পিরংগিয়া ফরেস্ট পার্কে তাদের অনেকগুলো বাড়ি ছিল। তরুণ ফানাফানা ছিল তাদের সর্দার। সেটা হাজার-হাজার বছর আগের ঘটনা। মাউন্ট পিরংগিয়া থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে হাকুরিমাতা রেঞ্জে একদল মানুষ বসবাস করত। তাদের গোত্রের নাম ছিল- রোয়ারাঙ্গা। রোয়ারাঙ্গা গোত্রের সর্দারের নামও ছিল রোয়ারাঙ্গা। রোয়ারাঙ্গার এক অপূর্ব সুন্দরী স্ত্রী ছিল। তার নাম ছিল টাফিয়াটু। টাফিয়াটু শুধু সুন্দরীই ছিল না, তার ছিল অসাধারণ এক প্রেমিকার মন। তার স্বামী রোয়ারাঙ্গি গোত্রের সর্দার বলে এসবের কিছুই বুঝত না। সারাদিন গোত্রের লোকজন নিয়ে ব্যস্ত থাকত। তবে স্ত্রীকে যে ভালবাসত না, তা নয়। অনেক ভালোবাসত। টাফিয়াটু ফুল ভালোবাসত, নদী ভালোবাসত, পাখি-প্রজাপতি ভালোবাসত। তার ছিল অসাধারণ এক গানের গলা। সারাদিন স্বামী রোয়ারাঙ্গি যখন গোত্রের লোকজন নিয়ে ব্যস্ত থাকত, তখন টাফিয়াটু একা একা হাকুরামাতা রেঞ্জে ঘুরত আর গান গেয়ে বেড়াত। এমনিই এক বসন্তের দিনে টাফিয়াটু ফুলের গান গাচ্ছিল। ঠিক তখন সেই পথ দিয়ে ফানাফানা মাউন্ট পিরংগিয়ার দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু যেতে গিয়ে অপূর্ব সুন্দর গলার গান শুনে সে থমকে দাঁড়ায়। গানের উৎসস্থল খুঁজতে গিয়ে আড়াল থেকে টাফিয়াটুকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। এভাবে একদিন-দুইদিন, এক মাস-দুই মাস। একসময় ফানাফানা টাফিয়াটুর পাওয়ার জন্য মগ্ন হয়ে যায়। ফানাফানা ছিল প্রেমের দেবতা। সে প্রেমের বাণ মারতে পারত। অপূর্ব সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারত। একদিন সে টাফিয়াটুকে প্রেমের বাণ মারে। প্রেমের বাণে টাফিয়াটু সঙ্গে সঙ্গেই স্বামী ও পারিপার্শ্বিকতা ভুলে ফানাফানার প্রেমে সম্মোহিত হয়ে যায়। একদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলে ফানাফানা টাফিয়াটুকে প্রেমের বাণ মেরে পাঁজাকোলে করে হাকুরিমাতা রেঞ্জ থেকে মাউন্ট পিরংগিয়াতে নিয়ে আসে। ফানাফানা টাফিয়াটুকে মাউন্ট পিরংগিয়াতে নিয়ে এসে বাঁশি বাজিয়ে প্রেমের সম্মোহনে সারারাত বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। কিন্তু ভোর হতেই সে টাফিয়াটুকে হাকুরিমাতা রেঞ্জে রেখে আসে। এদিকে হাকুরিমাতা রেঞ্জের সর্দার রোয়ারাঙ্গি সঙ্গে সঙ্গেই তা টের পেয়ে যায়। কিন্তু সে স্ত্রীর উপর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারে না বা স্ত্রীকে ঘরে বন্দী করেও রাখতে পারে না। কারণ ফানাফানা ছিল যেমন প্রেমের দেবতা, তেমনই অসম্ভব শক্তিধর। তার উপর ফানাফানা ছিল ভূত সম্প্রদায়ের। টাফিয়াটু ও ফানাফানার এই মিলন প্রায় প্রতিদিনই ঘটতে থাকে। আর রোয়ারাঙ্গি এদিকে অন্তর জ্বালায় দ্বগ্ধ হতে হতে নিজের ভেতর ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। এছাড়া তার কী-ই বা করার ছিল? ফানাফানাকে বাধা দেওয়া বা যুদ্ধ করার মতো তার শক্তি ও সাহস কোনোটাই ছিল না। একদিন রোয়ারাঙ্গি তারই গোত্রের এক বৃদ্ধের পরামর্শে এক জ্যোতিষের কাছে যায়। জ্যোতিষ তার সমস্ত কথা শোনে, চাঁদ-সূর্য নিয়ে গণনা করে রোয়ারাঙ্গিকে পরামর্শ ও সমাধান দেয়। পরামর্শটা হলো, রোয়ারাঙ্গিকে হাঙরের রক্ত তার বাড়ির চতুর্দিকে ছিটিয়ে দিতে হবে। টাফিয়াটুর সমস্ত শরীরে হাঙরের তেল মেখে দিতে হবে এবং সন্ধ্যাবেলায় তাকে হাঙরের মাংস রান্না করতে হবে। তাহলে আর ফানাফানা আর টাফিয়াটুকে নিতে পারবে না। এমন কী ফানাফানা টাফিয়াটুর কাছে ভিড়া থাক দূরের কথা বাড়ির আশেপাশেই ভিড়তে পারবে না। জ্যোতিষের পরামর্শ অনুযায়ী রোয়ারাঙ্গি তাই করে। সে তার লোকজন নিয়ে কাফিয়া হারবার থেকে বেশ কয়েকটা হাঙর ধরে নিয়ে আসে। সেই হাঙরগুলোর রক্ত সে বাড়ির চারপাশে ছিটিয়ে দেয়। হাঙরের তেল টাফিয়াটুর সমস্ত শরীরে মেখে দেয়। সন্ধ্যার পূর্বক্ষণ সে হাঙরের মাংস রান্না করতে বসে। প্রতিদিনের মতো সেদিন সন্ধ্যায়ও ফানাফানা পিরংগিয়া থেকে টাফিয়াটুকে নিতে হাকুরিমাতা রেঞ্জে আসে। আসার সময় তার ঘরে সুগন্ধী ছিটিয়ে বরাবরের মতো মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করে আসে। কিন্তু হাকুরিমাতা রেঞ্জে এসে ফানাফানা তৎক্ষণাৎ হোঁচট খায়। হাঙরের রক্ত তার পছন্দ নয়। অথচ বাড়ির চারপাশে হাঙরের রক্ত ছিটিয়ে দেওয়া আছে। হাঙরের তেলের গন্ধ শুঁকলে বমি আসে। কিন্তু সেই হাঙরের তেল টাফিয়াটুর সমস্ত শরীরে মেখে দেওয়া। ওদিকে ঘরের ভেতর থেকে বুদবুদ করে হাঙরের মাংসের রান্নার গন্ধ আসছে। ফানাফানা সারারাত একটা হাকুরিমাতা রেঞ্জের একটা গাছের উপর বসে থেকে টাফিয়াটুর বিরহে আর্তনাদ করতে থাকে, কিন্তু টাফিয়াটুর কাছে ভিড়তে পারে না। রোয়ারাঙ্গি এভাবে অনেকদিন এ ব্যবস্থা করে রাখে। টাফিয়াটুও স্বামীর আদেশ অমান্য করে ফানাফানার জন্য কিছু করতে পারে না। ওদিকে ফানাফানাও প্রতিরাতে এসে টাফিয়াটুর কাছে ভিড়তে না পেরে কোনো না কোনো গাছের মাথায় বসে থাকে। টাফিয়াটুর বিরহে তার বাঁশি বাজানো বন্ধ হয়ে যায়। এক সন্ধ্যায় ফানাফানা আর হাকুরিমাতা রেঞ্জে আসেনি। প্রেমিকা টাফিয়াটুর শোকে ও দুঃখে ধুঁকতে ধুঁকতে সন্ধ্যার পূর্বক্ষণে সে তার ঘরে মারা যায়।এর কিছুদিন পর টাফিয়াটুর মৃত্যুর খবর শুনে স্বামীর সব আদেশ ও বাধা অমান্য করে মাউন্ট পিরংগিয়া ছুটে আসে। পরে সে আর কখনো হাকুরামাতা রেঞ্জে স্বামীর ঘরে ফিরে যায়নি। ফানাফানার ফেলে যাওয়া ঘরে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। একদিন মাউন্ট পিরংগিয়াতেই টাফিয়াটু মারা যায়। গল্পটা এখানেই শেষ। বন্ধুরা, আপনারা হয়তো বলবেন, ফানাফানা ও টাফিয়াটুর প্রেমকথা একটা গাঁজাখুরি রূপকথার গল্প। কিন্তু এটা যে মাউরি আদিবাসীদের একটা ধর্মীয় বিশ্বাস। এছাড়া অবাক কিছু ব্যাপার হলো, মাউন্ট পিরংগিয়ায় সন্ধ্যার পর সত্যি একটা ভূতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পর্বতের চূড়ায় আশ্চার্য সুগন্ধে ভরে ওঠে। মাউন্ট পিরংগিয়ার পাদদেশেই পর্যটকদের জন্য একটা মোটেল। সেই মোটেল থেকে অনেক পর্যটক নাকি রাত ঘনিয়ে আসতেই মাউন্ট পিরংগিয়ার চূড়া থেকে কারও বাঁশির শব্দ শোনে। শব্দটা খুব মিহি ও হৃদয়স্পর্শী।

মহিবুল আলমগোল্ড কোস্ট, কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া।

ইমেইলঃ mohibulalam.k@gmail.com