প্রবাসে একটা কথা প্রচলিত আছে, সকালের বন্ধুত্ব বিকেলে থাকে না বা বিকেলের বন্ধুত্ব সকালে থাকে না। স্বার্থের একটু টান পড়লেই বন্ধুত্ব শেষ…। কথাটা পুরোপুরি সত্য না হলেও আংশিক যে সত্য তা বলতে পারি। আমরা যে শহরে বসবাস করি, কুইন্সল্যান্ডের গোল্ড কোস্ট, এখানে সবাই মোটামুটি ভালো। শিক্ষিত ও যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। অকারণে পরচর্চা করার খুব একটা সময় তাদের নেই। কিন্তু তারপরও দু-চারজন ‘বদনাম বাক্স’ আমাদের এই কমিউনিটিতে ঢুকে গেছে। ‘বদনাম বাক্স’ নামটা আমার সৃষ্টি। জলির সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে এদের প্রসঙ্গ এলে এদেরকে এই নামে ডাকি। একটা মজার ব্যাপার হলো, আমি সারাজীবন দেখেছি কেউ কারও শত্রু হলে পেছনে বদনাম বলে। কিন্তু ওরা শত্রু থাক দূরের কথা তাদের পরম মিত্রকে নিয়েও বদনাম বলে। এমন কিছু বদনাম বলে যা শুনলে ভিমড়ি খাওয়ার মতো। আদতে তাদের এই বদনামগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। কারণ পরেই আবার দেখা যায়, এই ‘বদনাম বাক্স’-রা তাদের মিত্রদের পায়ের কাছে বসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছে। সুন্দর সুন্দর গল্প বানাচ্ছে। গলায় ধরে গলে গলে পড়ছে। প্রথম প্রথম আমি বা জলি বুঝতে পারতাম না, বিভ্রান্ত হতাম। তবে একটা বিষয় না বললেই নয়, ‘বদনাম বাক্স’-রা গল্প বলতে পারে খুবই সুন্দর। ওরা মিথ্যাটাকে এত সুন্দর করে বলে যে আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, পৃথিবীতে যদি বানিয়ে বদনাম বলার জন্য কোনো নোবেল প্রাইজ থাকত, তাহলে ওরা পেয়ে আমাদের মুখ খুব উজ্জ্বল করত।

যাক, ধান ভানতে গিয়ে দুঃখের গান গেয়ে লাভ নেই। আমি বরং সুখের কিছু কথাই বলি। যে কথা বলতে গিয়ে ‘বদনাম বাক্স’-দের গল্পটা টেনে এনেছিলাম। এখানে ‘বদনাম বাক্স’-দের তুলনায় সুহৃদের সংখ্যাই অনেক বেশি। ওরা দুঃখের দিনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, বিপদে-আপদে কাছে টেনে নেয়। তখন এই প্রবাসে আমাদের আবেগপ্রবণ বাঙালি জাতিকে নিয়ে গর্ব হয়।
সুমন ভাই ও রুমি ভাবি আমাদের সেরকমই সুহৃদ। বন্ধুর অধিক বন্ধু, স্বজনের অধিক স্বজন। আমাদের পার্শ্ববর্তী শহর ইপ্সউইসের রেড ব্যাংক প্লেইনে থাকেন। এক বিকেলে ঝটিকা সফরে গোল্ড কোস্টে এসেছিলেন। এখানে গ্রীষ্মকাল চলছে। বিকেলটা বেশ দীর্ঘ। সারাদিনের চল্লিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার পর বিকেলের দিকে একটু শীতল হয়ে নরম বাতাস বয়ে আসে। তার ওপর গোল্ড কোস্ট শহরটা প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে বলে সমুদ্রের হিল হিল বাতাসে মন এমনিতেই জুড়িয়ে যায়। আমরা মাঝেমধ্যে নিজেরাই সৈকতে গিয়ে বসে থাকি বা সমুদ্রের তীর ধরে লং ড্রাইভে যাই।

সেদিন সুমন ভাই ও রুমি ভাবি আসাতে আমরা গিয়েছিলাম গোল্ড কোস্ট শহরের অদূরে কোলানগাট্টার কিরা বিচে বা কিরা বিচ লুক আউটে। বিকেল থেকে গোধূলিলগ্ন, তারপর অদ্ভুত সুন্দর অবয়বের মায়াময় সন্ধ্যা। সন্ধ্যার পর অনেকটা রাত। তবে একটা কথা কি, গোল্ড কোস্ট শহরে কখনও রাত নামে না। সৈকতে অসংখ্য ফ্লাডলাইটের আলোতে রাতটাও দিনের মতো হয়ে যায়। করোনাকালের কারণে হয়তো এখন পর্যটক অনেক কম। কিন্তু অন্যসময় অসংখ্য পর্যটকের ভিড়ে রাত আর দিনের পার্থক্য নিরূপণ করা যায় না। আর এই শহরে নিরাপত্তা এত বেশি যে রাত চারটা পাঁচটা কি, যেকোনো সময়ই সৈকতে গিয়ে পরিবার নিয়ে বসে থাকা যায়, সমুদ্রের জলে নেমে স্নান করা যায়।

একটা কথা কি, যে কোনো কারণেই হোক বাংলাদেশে কখনও আমার সমুদ্র দেখা হয়নি। এমন নয় যে শখ ছিল না। প্রচণ্ড শখ ছিল। কিন্তু কয়েকবার সুযোগ আসার পরও কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে আমার যাওয়া হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৯৭ সালে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে এসে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মাঙ্গানুইতে সমুদ্র সৈকত দেখি। আর এখন তো প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে সৈকতের শহর গোল্ড কোস্টেই থাকি। যে শহরটার চারিপাশে শুধু জল আর জল।


এবার আমার একটা গল্প বলি। এই গল্পটা আমি আরও দু-একস্থানে বলেছি। আজও এই গল্পটা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। ছোটবেলায় আমি ছিলাম খুব বাবার নেওটে। ষষ্ট বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়েও আমি বাবার কাঁধে উঠে ঘুরেছি। অষ্টম শ্রেণিতে বাবার কাঁধে উঠেছিলাম কিনা মনে নেই। ভাগ্যিস স্কুল মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত আমি ছোটখাটো মানুষ ছিলাম! আমি যখন স্কুল মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে যাই, এক আত্মীয় আমাদের বাড়িতে এসে আমাকে দেখে মাকে বলেছিলেন, ওমা ভাবী, এ কী, লিটন দেখি বামুন্যা! এর বিয়ের জন্য তো মেয়ে খুঁজে পাবেন না…! আমি হাতে পায়ে লম্বা হই কলেজে ওঠার পর।

বাবা উত্তর দেন, নদীর ওপারে সাগর দেশ আছে…।
আমি বাবার কথা বিশ্বাস করি। ভাবি, সত্যি বুঝি নদীর ওপারে সাগর দেশ আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করার পরপরই ১৯৯৭ সালে নিউজিল্যান্ড চলে আসি। তখন ইন্টারনেটের যুগ ছিল না। তাই গুগুলে সার্চ দিয়ে কোনোকিছু দেখার উপায়ও ছিল না। আসার আগে আমি দেশে বসে নিউজিল্যান্ড সম্বন্ধে ভাবতাম, দেশটা বুঝি সম্পূর্ণভাবে বরফে ঢাকা। ব্রিটিশ কাউন্সিল বা কোথাও একটা বইতে নিউজিল্যান্ডকে খুঁজতে গিয়ে তেমনই কয়েকটা বরফ ঢাকা ছবি দেখেছিলাম। আমার মামা আগে থেকেই নিউজিল্যান্ডে থাকতেন। তিনিও বাংলাদেশে বরফের গায়ে হেলান দিয়ে একটা ছবি পাঠিয়েছিলেন। তাই সেই বদ্ধমূল ধারণা নিয়েই নিউজিল্যান্ড আসি।

১৯৯৭ সালের জানুয়ারির পাঁচ তারিখ বাংলাদেশ ছেড়ে জানুয়ারির আট তারিখ মধ্যদুপুরে নিউজিল্যান্ডে এসে পৌঁছি। অকল্যান্ড এয়ারপোর্টে নামার পর-ই আমার ধারণা পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যায়। কোথায় বরফ, কোথায় কি? তখন নিউজিল্যান্ডে গ্রীষ্মকাল চলছিল। চারদিকে চকচকে সোনালি রোদ। আসার সময় বরফের দেশ ভেবে লাগেজে ভরে বঙ্গবাজার থেকে মোটা মোটা জ্যাকেট কিনে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণের দুয়ার থেকে এমন নরম উষ্ণ বাতাস আসছিল যে ওগুলোর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। সে রাতে মাউন্ট মাঙ্গানুই ফিরে দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে মামার বাসায় শুধু রাতেই নয়, পরদিন সারাদিন ঘুমাই। পরদিন বিকেল বা রাতে কোথাও বের হইনি। এর পরদিন মধ্য বিকেলে মাউন্ট মাঙ্গানুই শহরটা দেখতে বের হই। একাই। ছোট্ট শহর। মামার বাসা ছিল শহরের ঠিক উপকণ্ঠে, টিনাইও রোডে। টিনাইও রোড থেকে মাউন্ট মাঙ্গানুই সৈকত ছিল মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটার পথ।

আমি মাউন্ট মাঙ্গানুই শহরটা ঘুরে সমুদ্র সৈকতে যখন আসি, তখন সূর্যটা অনেকটাই পশ্চিমে হেলে পড়েছিল। আমি সৈকত ঘেঁষা একটা বড় পাথরের উপর বসি। সমুদ্রে তখন জোয়ারের টান ছিল। পাথরের উপর প্রশান্ত মহাসাগরের জল এসে আছড়ে পড়ছিল- ছলাৎ ছলাৎ, ছলাৎ ছলাৎ। আমার দৃষ্টির সামনে তখন দিগন্ত বিস্তৃত জল আর ঢেউয়ের পর ঢেউ। আমার সেই প্রথম সমুদ্র দেখা। তা-ও আবার বিদেশবিভূঁই, কোন দূরদেশের শহরে। পাথরে বসে থাকতে থাকতেই সূর্যটা টকটকে লাল হয়ে একসময় টুপ করে সাগরের জলে ডুব দেয়। সমুদ্রে জোয়ার ডাকে।

আমি সেদিন সত্যি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। আমার চোখে জল ছিল কিনা জানি না। আমার তখন ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে বাবার কথা মনে পড়েছিল। ভেবেছিলাম, এই বিশাল সমুদ্রের ওপারে কী? নিশ্চয়ই নদীর দেশ। বাবা যেমন বলেছিলেন, নদীর ওপারে সাগর দেশ। তেমনই সাগরের ওপারে তো নদীর দেশই থাকার কথা। যে নদীটা আমার নিজস্ব নদী, গোমতী…!
বন্ধুরা, সেই তেইশ বছর আগের এত ফিরিস্তি কেন টানলাম জানেন, আজও যখন সমুদ্র সৈকতে গিয়ে বসে থাকি তখনই বাবার কথা মনে পড়ে যায়। আমার গোমতী নদীর কথা মনে পড়ে। আমার সেই গ্রাম। আমার সেই দেশ- বাংলাদেশ।

আমরা সেদিন কিররা বিচ লুকআউটে বেশ রাত অব্ধি সময় কাটিয়ে যখন ঢাল বেয়ে নামছিলাম তখনও আমাদের চোখের সামনে প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউ দোল খাচ্ছিল। কিররা লুকআউট পয়েন্ট একটা পাহাড়ের উপর। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতেই ঠিক পাদদেশে প্রশান্ত মহাসাগর। পাহাড়ের উপর থেকেই বিস্তৃত সবুজ জলের ফেনিল স্রোতের আছড়ে পড়া দেখা যাচ্ছিল, আর জলের শব্দ শোনা যাচ্ছিল- ছলাৎ ছলাৎ, ছলাৎ ছলাৎ। কী মুগ্ধ করা শব্দ! সেই সমুদ্রের তীর, দিঘল সৈকত, পাহাড়ের ঢাল, রাতের স্তব্ধতা…! আমি বরাবরই সমুদ্র সৈকতে এলে তেইশ বছর আগের স্মৃতিতে ক্ষয়ে যাই। বারবারই মনে হয়, বাবার কথাই ঠিক। নদীর ওপারে সত্যি সাগর দেশ বা সাগরের ওপারে সত্যি নদীর দেশ…!